রোনালদো -একজন অপরাজিত সৈনিকের অসমাপ্ত গল্প।

রোনালদো

রোনালদো পর্তুগালের মাদেইরা শহরের ছোট্ট এক মফস্বলের নাম  ফুঞ্চাল।৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫

ফুঞ্চালের এক দরিদ্র দম্পতি জোসে দিনিস আভেইরা এবং মারিয়া ডোলোরেস দস সান্তোস আভেইরার ঘর আলো করে জন্ম নেয় তাদের চতুর্থ সন্তান।

পিতা জোসে দিনিস আভেইরা মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ডো আভেইরার নামানুসারে পুত্রের নাম রাখেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস এভেইরা।

উপরের কথাগুলো পড়ে মনে হতে পারে শিশুটির জন্ম ছিলো তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত খুশির ব্যাপার।

কিন্তু এই ছোট্ট শিশুটির জন্ম ছিলো অনাকাঙ্খিত, তার পৃথিবীতে আগমন খুব সহজ ছিলোনা।

কারনটা তার পরিবারের দারিদ্রতা, এবং পিতা দিনিস আভেইরার অতিমাত্রায় মদ্যপান।

তিনি পেশায় ছিলেন একজন মালি, মাদেইরা শহরের পার্কগুলোতে কাজ করে তিনি যা উপার্জন করতেন তার সম্পূর্নটাই খরচ করে দিতেন মদ্যপানের পেছনে।

আগে থেকেই ৩ সন্তান নিয়ে দারিদ্রতায় ধুকতে থাকা পরিবারটি যখন জানতে পারে তাদের ঘরে আরোও একজন সদস্য যোগ হতে চলেছে তখন মা মারিয়া ডেলোরেস সিদ্ধান্ত নেন তিনি শিশুটিকে পৃথিবীতে আসতে দিবেন না।

কারন ওই মুহুর্তে পরিবারে আরো একজনের ভরনপোষন তাদের পহ্মে ছিলো প্রায় অসম্ভব।

শিশুটিকে গর্ভপাত করাতে যখন মা মারিয়া ডেলোরেস হাসপাতালে পৌছান তখন হাসপাতালের একজন নার্স বাচ্চাটিকে গর্ভপাত করাতে বারন করেন।

ঈশ্বর চাইলে সবই সম্ভব, কেউ না বুঝতে পারলেও ঈশ্বরের বুঝতে বাকি ছিলোনা এই শিশুটিই একদিন পৃথিবীর কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হবে, কোটি মানুষের হাসির কারন হবে, কোটি মানুষের আবেগকে জয় করে নিবে নিজের অসাধারন দহ্মতায়।

তাইতো ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই ডাক্তারের বারন শুনে মন পাল্টে যায় মারিয়া ডেলোরেসের।

তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যাই হোক তিনি শিশুটিকে বাচিয়ে রাখবেন এবং পৃথিবীর আলো দেখাবেন।

এবং ওনার এই সাহসী সিদ্ধান্তেই জন্ম নেয় বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর।

এটি ছিলো তার জন্মের কাহিনী, এবার আসুন পড়ে আসি তার শৈশব এবং বেড়ে উঠার গল্পটি।

শিশু রোনালদো ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে, মাত্র ৩ বছর বয়সেই তার বাবা-মা তার মাঝে ফুটবলের প্রতি অন্যরকম এক ভালোবাসা লক্ষ করেন।

মাত্র ছয় বছর বয়সে রোনালদো যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তো তখনই সে তার বিদ্যালয়ের ফুটবল দলে জায়গা করে নেয়।

শৈশবে তাকে আরো বড় একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তার হৃদপিন্ডে সমস্যা ধরা পড়ে, তখন সঠিক সময়ে অপারেশন না করা হলে হয়তো আমরা আজকের রোনালদোকে পেতাম না। বিধাতা বার বার তাকে বাচিয়ে রেখেছেন, এজন্য অবশ্যই বিধাতার প্রতি তার ভক্তকূল চির কৃতজ্ঞ।

মাত্র আট বছর বয়সেই রোনালদোর ফুটবল প্রতিভা দেখে অবাক হয়ে তার বাবা জোসে দিনিস আভেইরা রোনালদোকে সেখানকার একটি অপেশাদার ক্লাব ” আন্দোরিনহাতে ” ভর্তি করান, যেখানে জোসে দিনিস কাজ করতেন।

সেই ক্লাবে মাত্র দুই বছর খেলেই রোনালদো গোটা মাদেইরাতে আড়োলন সৃষ্টি করে।

মাদেইরার শীর্ষ দুটি ক্লাব “সিএস মারিতিমো” এবং “সিডি ন্যাশিওনাল” তাকে দলে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে।

মাত্র ১০ বছর বয়সেই মাদেইরার শীর্ষস্থানীয় ক্লাব “সিডি ন্যাশিওনাল” তাকে দলে ভেড়ায়।

সেখানে দুর্দান্ত খেলে সেই মৌসুমেই ক্লাবকে শিরোপা জেতান রোনালদো।

তার প্রতিভা তখন গোটা পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়েছে।

তার প্রতিভা দেখে আগ্রহী হয়ে পর্তুগালের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব স্পোর্টিং লিসবন তাকে চুক্তিবদ্ধ করে।

রোনালদো

পর্তুগীজ ক্লাব স্পোর্টিং সিপির জার্সি গায়ে রোনালদো।

স্পোর্টিং লিসবনে অভিষেক ম্যাচেই মোরেইন্সের বিপহ্মে রোনালদো জোড়া গোল করে সবাইকে অবাক করে দেয়।

তারপর সে উয়েফা অনুর্ধ ১৭ চ্যাম্পিয়নশীপে পর্তুগাল অনুর্ধ ১৭ দলে ডাক পায়।

অনুর্ধ ১৭ চ্যাম্পিয়নশীপে ৭ ম্যাচে ৫ গোল করে রোনালদো ফুটবল বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

তখন লিভারপুলের তৎকালীন ম্যানেজার জেরার্ড হুলিয়ার রোনালদোর ব্যাপারে আগ্রহী হন এবং ক্লাবকে তাকে কেনার ব্যাপারে প্রস্তাব দেন।

কিন্তু লিভারপুল কতৃপহ্ম তাকে দলে নিতে অস্বিকৃতি জানায় কারন তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১৬ বছর, এবং তার শীর্ষ ফুটবলার হয়ে ওঠা তখনো অনেক সময়ের ব্যাপার ছিলো।

স্পোর্টিং লিসবনে অনুর্ধ ১৮ চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালে স্পোর্টিং লিসবন ম্যানেজার রোনালদোদের খেলা দেখতে এসে বলেন,  ” আজ ফাইনাল ম্যাচে তোমাদের মধ্যে যে বেশি গোল করবে সে একাডেমি দলে জায়গা পাবে “

সেই ম্যাচ স্পোর্টিং লিসবন জিতে ৩-০ গোলে ।

রোনালদো করেন ২ গোল এবং তার ক্লাব সতীর্থ ফ্যানত্রাও করে এক গোল।

ওই ম্যাচে নিজের নিশ্চিত গোল মিস করে রোনালদোকে গোলে সহায়তা করে ফ্যানত্রাও, কারন সে জানতো রোনালদোর প্রতিভা তার চেয়ে বেশি।

এবং রোনালদো একাডেমী দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য দাবিদার।

পরবর্তীতে অবশ্য ফ্যানত্রাও এর ক্যারিয়ার বেশিদিন টিকেনি, তবুও বন্ধুর কথা ভুলেনি রোনালদো ।

এখন ফ্যানত্রাও এর আর্থিক অবস্থার মুল চাবিকাঠি রোনালদো।

রোনালদো ২০০২-০৩ মৌসুমে স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ২৫ ম্যাচ খেলে এবং ৩ টি গোল করে।

পুরো সিজন জুড়ে তার পারফর্মেন্স ছিলো দুর্দান্ত।

তার জীবনের আসল প্রত্যাবর্তন হয় ২০০৩ সালে।

ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সাথে স্পোর্টিং লিসবনের একটি প্রিতী ম্যাচ আয়োজন করা হয়।

দিনটি ছিল ৬ আগষ্ট।

প্রিতী ম্যাচ খেলতে সেদিন লিসবনে আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলের কোচ ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন।

ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ফার্গি রোনালদোর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান।

ম্যাচটি রোনালদোর স্পোর্টিং লিসবন ৩*১ গোলে জিতে যায়।

ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে রোলাদোয় মুগ্ধ ফার্গি সরাসরি বলে দেন ” আমার যেকোনো মুল্যে রোনালদোকে চাই “

কেউ না বুঝলেও ফার্গি সেদিন বুঝেছিলেন এই ছেলেই একদিন ইতিহাস তৈরী করবে।

ব্যস যেই কথা সেই কাজ ২০০৩ সালে স্পোর্টিং লিসবন থেকে ১৬ মিলিয়ন ইউরোতে রোনালদোকে দলে ভেরায় ফার্গির ম্যানইউ।

লিসবনে ২৮ নাম্বার জার্সি পড়ে খেলা রোনালদোর ম্যানইউতে জার্সি নাম্বার হয় ৭।

অবাক হচ্ছেন?  হ্যা তখন সবাইকে অবাক করে দিয়েই স্যার ফার্গি রনের হাতে তুলে দেন জর্জ বেস্ট, ক্যান্টোনা, ব্যাকহামদের ৭ নাম্বার জার্সিটি।

রেড ডেভিলদের হয়ে রোনালদোর অভিষেক হয় বোল্টন ওয়ান্ডার্সের বিপহ্মে।

অভিষেক ম্যাচের ৬০ মিনিটে বদলি খেলোয়ার হিসেবে মাঠে নেমেও দারুন পারফর্মেন্স করে রোনালদো এবং সেই ম্যাচে দলকে একটি পেনাল্টিও এনে দেয় সে।

২০০৬-০৭ মৌসুমে সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম প্রিমিয়ার লীগ শিরোপা জিতে, এর পরবর্তী দুই মৌসুমেও সে দলের হয়ে এই শিরোপা জিতে।

রোনালদো

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর জার্সি গায়ে রোনালদো।

সে রেড ডেভিলদের  হয়ে ২০০৩-২০০৯ পর্যন্ত মোট ৬ বছর খেলেছে।

২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লীগ জয় করে  সে এবং ক্যারিয়ারে প্রথম বারের মত চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের স্বাদ পায় এবং প্রথমবারের মত বর্ষসেরা ফুটবলারও নির্বাচিত হয় ।

ম্যানচেস্টারে ছয় বছরে তার অর্জন-

৩ টি লীগ শিরোপা

১ টি এফএ কাপ

২ টি চ্যাম্পিয়নস লীগ

২ টি লীগ কাপ

১ টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ।

মোট ৯টি শিরোপা জয় করে। এছাড়াও রেড ডেভিলদের হয়ে ১৯৬ ম্যাচে করে ৮৪ টি গোল।

২০০৯ সালেই তার ম্যানচেস্টার ইউনাইট অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

২০০৯ সালের ১ জুলাই (তৎকালীন রেকর্ড পরিমান) ৮০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ৬ বছরের চুক্তিতে তাকে দলে ভেড়ায় স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ।

২১ জুলাই রিয়ালের হয়ে অভিষেক হয় তার।

রিয়ালের লিজেন্ড রাউল গন্জালেস রিয়াল ছাড়ার পর রিয়ালের ৭ নাম্বার জার্সিটিও পেয়ে যায় রোনালদো। রিয়াল ক্যারিয়ারের প্রথম মৌসুমেই ৩৫ ম্যাচে ৩৩ গোল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় রন, সেই মৌসুমে ৬ টি হ্যাট্রিকও যোগ হয় তার ক্যারিয়ারে। 

রোনালদো

২০১৭-১৮ সিজনের চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা জয়ী রোনালদো।

রিয়ালের হয়ে দুর্দান্ত পথচলা শুরুর পর তাকে আর কখনো পিছু ফিরে দেখতে হয়নি।

রিয়ালের হয়ে বিগত বছরগুলোতে একের পর এক অর্জন নিয়ে এবং রেকর্ড তৈরী করে তার ক্যারিয়ার এখন সুবিশাল।

২০১৮ তে গ্রীষ্মের দলবদলে সে রিয়াল ক্যারিয়ারের ইতি টেনে পাড়ি জমায় ইতালীয়ান জায়ান্ট জুভেন্তাসে।

রোনালদো

জুভেন্তাসের হয়ে গোল করার পর সেলিব্রেশনে ব্যস্ত রোনালদো।

তুরিনে আসার পর প্রথম মৌসুমেই জিতেছে ইতালিয়ান সিরি-আ।

তুরিনোর বুড়িদের সাদা কালো জার্সি গায়ে জড়ানোর পর হয়তো আবারো তার হাতে ধরা দিবে ইউরোপ সেরার মুকুট।

ভক্তকূল এখন অপেক্ষার  এটারই অপেক্ষায়।

জাতীয় দল পর্তুগালের হয়ে তার ক্যারিয়ারও খুব রঙ্গিন।

পর্তুগালের হয়ে ২০১৬ সালের জয় করেছেন ইউরো। এবং ২০১৯ উয়েফা ন্যাশন্স লীগের শিরোপাও ধরা দিয়েছে তার হাতেই।

২০০৩ সালে কাজাখস্তানের বিপহ্মে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় রোনালদোর।

পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোল গ্রীসের বিপহ্মে ২০০৪ ইউরোতে।

রোনালদো

পর্তুগালের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন রোনালদো।

২০০৪ ইউরোতে দুর্দান্ত পারফর্মেন্স করে সে পর্তুগালকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যায়।

এরপর সে পর্তুগালের হয়ে ২০০৬ বিশ্বকাপ ২০০৮ ইউরো ২০১০ বিশ্বকাপ ২০১২ ইউরো খেলেও পর্তুগালকে কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতাতে পারেনি কিন্তু ২০১৬ ইউরোতে সে পর্তুগালকে প্রথমবারের মত বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে।

এতসবের পর বর্তমানটা হয়তো কারোর অজানা নেই, রোনালদো এখন কোটি হৃদয়ের ভালোবাসায় সিক্ত।

বর্তমানে ফুটবলের অর্ধেক যদি হয় লিওনেল মেসি তবে আর অর্ধেকটায় চলে রোনালদোর রাজত্ব।

এই ছিলো রোনালদোর অপারেজয় ক্যারিয়ারের অসমাপ্ত গল্প, মাদেইরার সেই হতদরিদ্র পরিবারের সাধারন ছেলেটি আজ পৃথিবীর অন্যতম সেরা একজন ফুটবলার।

গল্পে তার জীবন থেকে কিছু খন্ডমাত্র তুলে ধরা হয়েছে, সময়ের অভাবে সবকিছু তুলে ধরতে পারিনি।

ভুলত্রুটি হ্মমাযোগ্য।

ক্রিস,

এভাবেই দিনের পর দিন দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়ে আজও প্রতিটি ভক্তের মনে আকড়ে আছো তুমি।

ধন্যবাদ তোমায় একটি প্রজন্মকে ফুটবলের মাহাত্ব্য বোঝানোর জন্য।

অন্যান্য পোস্টঃ Donald Trump-3 Sectors Where Reaches For Success

Share This Post
Have your say!
00

Customer Reviews

5
100%
4
0%
3
0%
2
0%
1
0%
0
0%
    Showing 2 reviews
  1. Nice
    0

    0

    You have already voted!

Leave a Reply

Thanks for submitting your comment!